রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা করে দিলেন হাসনাহেনা বেগম

বিশেষ পাকিবেদক ।। ৩০ জুলাই ২০১১

ঘটনাটি ঘটেছিলো ৪০ বছর আগের এক শ্রাবণ সন্ধ্যায়। এরপর তাদের কোন দেখা সাক্ষাত ছিলো না। কেউ কাউকে এক ঘন্টার জন্যও দেখেনি। ওই ঘটনার পর গ্রামে গত ৪০ বছরে এরকম আরো শ’খানেক ঘটনা ঘটে। কিন্তু হাসনাহেনার মনে দাগ কেটে আছে সেই ঘটনাটি। আজো ভুলতে পারেননি সে সন্ধ্যার কথা। সেদিন অনেক স্বপ্ন ছিলো হাসনাহেনার বুকের কোণে। একটু একটু করে গড়া ভালোবাসার সুখপত্র সেদিনের সন্ধ্যায় শ্রাবণের জলস্রোতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। হারিয়ে গেলো আরো কতকিছু!

হাসনাহেনা বেগমের সাথে যদি সেদিন রাষ্ট্রপতি এ প্রতারনা না করতেন, তাহলে আজ হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। আট দশটা ছেলেপুলেতে উঠোন ভরে থাকতো। রাষ্ট্রপতিও থাকতেন। কিন্তু তাতো আর হলো না। শূন্য বিরাণভূমিতে একমাত্র স্বামী নিয়ে টেনেটুনে বেঁচে আছেন হাসনাহেনা বেগম।

৪ ভাইয়ের মধ্যে সেজো ছিলেন মো: রাষ্ট্রপতি চৌধুরী। বাকি তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়ভাই মো: ডাক্তার মিয়া পেশায় একজন মুদি দোকানদার। মেজোভাই মো: উকিল উদ্দিন এখন কিছু করেন না। এক সময় ইউনিয়ন পরিষদে চাকুরি করতেন। ছোটভাই মো: মিনিস্টার আলী একটি প্রাইমারি স্কুলের সহকারি শিক্ষক। বৃদ্ধ বাবা মা এবং ভাই বোনদের খরচ চালাতেন বড় ভাই ডাক্তার মিয়া। কিন্তু সব উলট পালট হয়ে যায় রাষ্ট্রপতির কারণে। কাউকে কিছু না জানিয়ে মন দিয়ে বসেন শত্রুপক্ষ খান পরিবারের মেয়েকে। বড়ভাই ডাক্তার মিয়া তা কোনভাবেই মেনে নেননি।

একদিন পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করে হাসনাহেনা এবং রাষ্ট্রপতি। ইচ্ছে ছিলো অন্তত একটি টিনের ঘরে ভালোবাসার সংসার পাতবেন। কিন্তু বড় ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের কাছে হার মানতে হয় রাষ্ট্রপতি চৌধুরীকে। সেদিনের সে শ্রাবণ সন্ধ্যায় প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করেও রাষ্ট্রপতির দেখা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান হাসনাহেনা বেগম। রাষ্ট্রপতি চৌধুরী ততক্ষণে হুজুরের পানি পড়া খেয়ে পুরো বদলে গেলেন। ভুলে গেলেন হাসনাহেনার কথা, এতোদিনের প্রেমের কথা।

৪০ বছর পরে গতকাল বসুন্ধরা সিটির সামনে সে কি এক মধুর সময়ের দেখা পেলো বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি এবং হাসনাহেনা। দু’জনই নাতি এবং নাতনিকে নিয়ে বসুন্ধরা সিটির ফুডকোর্টে খেতে গিয়েছিলেন। বের হয়ে ট্যাক্সি ডাকতে গিয়ে চিরচেনা সেই চারটি চোখ ৪০ বছর পর আবার এক হলো। আজ দু’জনের বয়সই ষাটের কাছাকাছি। তাতে কি, প্রেমতো ষাট ঘাট মানে না। চশমার ভেতরটা অশ্রুর বাষ্পে বারবার ঘোলা হয়ে যাচ্ছিলো। পাশে সিঁড়িতে বসে কিছুক্ষণ কথা হলো। হুজুরের পানিপড়া আজ এতোদিন পর আর কাজ করলো না। দাবিয়ে রাখতে পারেনি হৃদয়ের আকুতিকে।

এ সময় হাসনাহেনা বেগমের নাতনী বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য তার নানীকে অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রপতির নাতিও দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করে। উভয়ের চাপের মুখে হাসনাহেনা বেগম বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা করতে বাধ্য হন। ক্ষমা শেষে দু’জনই কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে চাইলে নাতি নাতনীর বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে প্রচুর লোকজনের সমাগম ঘটে। ভিড় সামলাতে গিয়ে বসুন্ধরা সিটির নিরাপত্তা কর্মীরা কয়েকবার হিমশিম খায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: