সরকারই অপহরণকারী : হাফেজ মাওলানা হাসানাতকে ফিরিয়ে দিন

হাফেজ মাওলানা আবুল হাসানাতকে অপহরণের পর পেরিয়ে গেছে সাত-সাতটি দিন। বুড়িগঙ্গা দূষিত হলেও তার বুকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে অনেক পানি। স্বজনদের উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, আতঙ্ক আকাশ ছুঁয়ে গেছে। তারপরও পুলিশ প্রশাসন এবং শেখ হাসিনার সরকার নির্বিকার। সবার চোখের সামনে দিয়ে প্রকাশ্য দিনের আলোতে সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গেলেও আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশের বড় বড় কর্তা পর্যন্ত কেউই দায়িত্ব স্বীকার করেননি। উল্টো খ্যাতনামা আলেম মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনী সাহেবকে ‘জারজ’ বলে দিব্যি গালি দিয়ে বসেছেন এক প্রতিমন্ত্রী। মানবিকতা বা রাজনৈতিক শিষ্টাচার যাই-ই বলি, কোনো কিছুরই আর এই সরকার অবশিষ্ট রাখল না।

একবিন্দু এদিক সেদিক করিনি, খোদার্কসম!

ক্রমাগত অপহরণ আতঙ্কে জনজীবন যখন সন্ত্রস্ত, সেই সময়, সেই সঙ্কট নিরসনে সামান্য কোনো উদ্যোগ না নিয়ে সরকার ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বিরক্তিকর চিত্কার-চেঁচামেচি করেই যাচ্ছে। এর ফলে এমন ধারণা খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, সরকারের অন্যায় ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অনমনীয় আন্দোলন অব্যাহত রাখায় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টির নোংরা মানসিকতা থেকেই সরকার হাফেজ মাওলানা আবুল হাসানাতকে অপহরণ করেছে। সরকারের নির্দেশে এমন অপহরণে জনজীবন আজ পুরোপুরি নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠেছে বলে ওয়াকেবহাল মহলের দৃঢ় অভিমত।

মাওলানা আবুল হাসানাত শুধু একজন খ্যাতনামা তরুণ আলেমই নন, তিনি পবিত্র কোরআন শরীফের একজন হাফেজ। তিনি সেই অর্থে কোনো সাধারণ নাগরিকও নন। তিনি দেশের বরেণ্য আলেমে দ্বীন, ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম সমাজের নেতা ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রধান মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনীর ছেলে। এ রকম একজন মানুষকে গত ১০ এপ্রিল রাজধানীর টিপু সুলতান রোড থেকে বেলা ১১টার দিকে তার দুই বন্ধু ও অজস্র পথচারীর সম্মুখ থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সাদা পোশাকের পুলিশ। এই অপহরণের কাজটি সরকার করল এমন এক সময়ে যখন সরকারের নারীনীতির বিরুদ্ধে মুফতি আমিনীর নেতৃত্বে দেশের সর্বস্তরের আলেম সমাজ আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। পালন করেছে একটি সফল হরতাল। ঘোষণা দেয়া হয়েছে আরও কঠোর কর্মসূচির। মুফতি আমিনীকে মানসিকভাবে দুর্বল ও বিপন্ন করার জন্যই যে এ রকম ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। যে কারণে সরকার আজও এই অপহরণের দায়িত্ব স্বীকার করার সত্ সাহসটুকু দেখাতে পারনি। এ কারণে জানাও যাচ্ছে না মাওলানা হাসানাত জীবিত না মৃত।
এ সরকারের অপহরণ রাজনীতি এই প্রথম নয়। এর আগে, এখান থেকে এক বছর আগে তারা অপহরণ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে জনসম্মুখে হাজির করার জন্য বারবার দাবি করা হয়। কিন্তু সরকার ছিল নির্লিপ্ত ও নির্বিকার। যেমন মাওলানা আবুল হাসানাতের ব্যাপারে ‘ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানে না’র ভাব ধরেছে সরকার।
সত্যিকার অর্থেই দেশ আজ এক চরম সঙ্কটে পতিত। ক্ষমতাসীনদের দাপটে, তাদের আশ্রিত দুর্বৃত্তদের দুঃসহ অত্যাচার, লুটপাট, খুন, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া। গ্যাস নেই, বিদ্যুত্ নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই, চাকরি নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রতিদিন সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ নির্বিচারে হত্যা করছে বাংলাদেশের নাগরিক তার কোনো প্রতিবিধান নেই। মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্ট মর মর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কুরুক্ষেত্র। কৃষি খাত অভিভাবকশূন্য। সবমিলিয়ে মারাত্মক এক হতাশা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। অথচ সে সব প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেয়ার বদলে সরকার তার ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগকে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মতো ব্যবহার করে দেশে এক নারকীয় একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। দেশের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টের সবগুলো কাজই করেছে এ সরকার। সংবাদপত্রের ওপরও চলছে নিপীড়ন। বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীদের প্রতিবাদ স্তব্ধ করার জন্য বেছে নিয়েছে দমন-পীড়ন ও অত্যাচার-নির্যাতনের হিংস্র কৌশল। ইদানীং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপহরণ রাজনীতি।
সবাই জানে না। দমনপীড়নের পথ গণতান্ত্রিক পথ নয়। এই পথ কল্যাণের পথ নয়। পুলিশ কিংবা দলীয় মিলিশিয়া দিয়ে জোর-জুলুম করে তাত্ক্ষণিক কিছু ফায়দা হয়তো হাসিল করা যায়। কিন্তু গণদাবিকে রুদ্ধ করা যায় না। বঞ্চিত লাঞ্ছিত মানুষকে বেশিদিন ঠেকিয়েও রাখা যায় না। এই সরকার হত্যা, অপহরণ, অত্যাচার করে দুঃশাসনে পিষ্ট দেশের মানুষকে বেশিদিন দাবিয়ে রাখতে পারবে না। মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে এদেশের মানুষ কোনো স্বৈরাচারী সরকারকেই ছাড় দেয়নি। দেবেও না।
আমাদের সরকার এখন হয়তো ইতিহাসের এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারছে না। তবে পারা উচিত। নইলে খুব বড় ধরনের কাফফারা দিতে হবে সবাইকে, যা কারও কাম্য নয়।
আমরা প্রত্যাশা করব, সরকার হাফেজ মাওলানা আবুল হাসানাতকে যত দ্রুত সম্ভব ছেড়ে দেবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: